খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১
খুলনায় কামরুল সাম্রাজ্য উন্নয়নের আড়ালে দুর্নীতির অদৃশ্য নেটওয়ার্ক
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৬-০১-২০২৬ ০৫:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৬-০১-২০২৬ ০৫:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন
কামরুল
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসানকে ঘিরে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
স্থানীয় ঠিকাদার, গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ থেকে খুলনায় বদলি হয়ে আসার পর থেকেই এসব অভিযোগ আরও দৃশ্যমানভাবে সামনে আসে। তাদের দাবি, বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব দিন দিন বেড়েছে এবং সেই প্রভাবকে ঘিরেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে তিনি একজন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন—যার প্রভাব প্রকল্প বাস্তবায়ন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনায় পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন সিএন্ডবি কলোনি ও জোড়া গেট এলাকার সরকারি ভবন বিক্রয়ের নিলাম দরপত্র। স্থানীয়দের দাবি, এসব নিলামে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ে ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ, সময়সূচি ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, যা নিয়ে একাধিকবার আপত্তি উঠলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় ঠিকাদারদের একটি অংশের অভিযোগ, বিভাগের কাজ বণ্টনে একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তাদের দাবি, তথাকথিত ‘হিডেন টেন্ডার’ বা গোপন দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স বের করে কাজ বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলেন, এই ব্যবস্থার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিতভাবে কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রকল্পের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন ছাড়া কাজ এগোনো কঠিন হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার ও কর্মকর্তা জানান, প্রাক্কলন অনুমোদন, দরপত্র অনুমোদন কিংবা টেন্ডার ইভ্যালুয়েশন কমিটির (টিইসি) রিপোর্টে অগ্রগতির ক্ষেত্রে ঘুষের চাপ সৃষ্টি করা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব দাবিতে রাজি না হলে ফাইল আটকে রাখা, অযৌক্তিক জটিলতা তৈরি কিংবা মানসিক চাপ দেওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। এতে করে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকারি কাজের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
মো. কামরুল হাসানের পূর্ববর্তী কর্মস্থল গোপালগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালেও একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তাদের দাবি, ওই প্রকল্পটি এক পর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের নজরদারিতে আসে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের কারণে তদন্ত কার্যক্রম কার্যকরভাবে এগোয়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়, তবু সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর ধারাবাহিকতা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের আরেকটি অভিযোগ হলো, বিগত সরকারের সময়ে তিনি একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে উপস্থাপন করে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, একজন সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও পেশাগত সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সেখানে এ ধরনের অভিযোগ প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার বলা হলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ না থাকায় প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত ছাড়া সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়। তারা আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, যাতে সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং জনস্বার্থ রক্ষা পায়।
এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাসান তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি নেই এবং তিনি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতিতে জড়িত নন। তার ভাষ্য, তিনি সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করছেন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে সত্য উদঘাটনের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র পথ, যা প্রশাসনিক আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স